সামরিক দম্ভ নাকি বাস্তবতার মূল্যায়ন— যুক্তরাষ্ট্র কি তার কৌশলগত ভুল করেই চলবে?
সামরিক দম্ভ নাকি বাস্তবতার মূল্যায়ন— যুক্তরাষ্ট্র কি তার কৌশলগত ভুল করেই চলবে?যুদ্ধ কেবল যুদ্ধক্ষেত্রেই জেতা যায় না; মাঝেমধ্যে সামরিক শক্তির অতি-আত্মবিশ্বাস ও ভুল হিসাব-নিকাশের কারণেই সবচেয়ে বড় পরাজয়গুলো ঘটে। মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির ইতিহাস এমন দৃষ্টান্তে ভরপুর, যেখানে বাস্তবসম্মত বিশ্লেষণের বদলে অস্ত্রের অহংকারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে। আর এর পরিণতি হিসেবে ওয়াশিংটন দীর্ঘ, ব্যয়বহুল ও নিষ্ফল যুদ্ধের ফাঁদে আটকা পড়েছে।
ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ‘চল্লিশ দিনের যুদ্ধ’-কেও এই দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। সামরিক শক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের পক্ষে ভারসাম্য পরিবর্তনের লক্ষ্যে এই যুদ্ধ শুরু হলেও, বাস্তবে তা ‘হার্ড পাওয়ার’ বা সামরিক শক্তির সীমাবদ্ধতা প্রমাণের একটি পরীক্ষায় পরিণত হয়েছিল।
এই প্রেক্ষাপটে মার্কিন সাময়িকী ফরেন অ্যাফেয়ার্স তাদের এক গভীর বিশ্লেষণে লিখেছে, অপারেশন ‘এপিক ফিউরি’-এর প্রাক্কালে পেন্টাগন এই সিদ্ধান্তে পৌঁছেছিল যে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়েই যুক্তরাষ্ট্র দ্রুত ও চূড়ান্ত বিজয় অর্জন করতে পারবে। তাদের ধারণা ছিল— তীব্র আক্রমণ, প্রযুক্তিগত শ্রেষ্ঠত্ব এবং আভিযানিক সক্ষমতার জোরে ইরান অল্প সময়ের মধ্যেই পিছু হটতে বাধ্য হবে। কিন্তু বাস্তবে মাঠে ঘটেছে ঠিক উলটোটা। ওয়াশিংটন তাদের কৌশলগত লক্ষ্য তো অর্জন করতেই পারেনি, উলটো ইরানও তার অবস্থান থেকে একচুলও সরে আসেনি।
ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এর ভাষায়, এই ভ্রান্ত ধারণার বশবর্তী হয়ে যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজেদের তৈরি করা এক ঘৃণ্য পরিস্থিতির শিকার; এমন এক পরিস্থিতি, যা ওয়াশিংটনের জন্য কোনো টেকসই অর্জন তো আনতেই পারেনি, বরং তাদের ওপর চাপিয়ে দিয়েছে বিশাল নিরাপত্তা, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক মূল্যের বোঝা।
ক্ষমতার ভ্রান্ত ধারণা ও অতীতের পুনরাবৃত্তি
যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারকদের ক্ষমতার ধারণার প্রতি এই মূল্যায়ন অত্যন্ত সমালোচনামূলক। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ওয়াশিংটনে বারবার এ ধারণা মাথাচাড়া দিয়ে উঠেছে যে, ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলোর সদিচ্ছাকে চাইলেই সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে প্রতিস্থাপন করা সম্ভব। একই মানসিকতার কারণে ইরাক ও আফগানিস্তানে যুক্তরাষ্ট্রকে চরম বিপর্যয়ের মুখে পড়তে হয়েছিল। উভয় যুদ্ধই নিরঙ্কুশ সামরিক শ্রেষ্ঠত্ব দিয়ে শুরু হলেও শেষ পর্যন্ত ওয়াশিংটন তাদের কাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয় এবং বছরের পর বছর বিপুল অর্থ ব্যয় করে তাদের শূন্য হাতে ফিরতে হয়।
ইরানের ক্ষেত্রেও একই ভুল হিসাব-নিকাশের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে। যুক্তরাষ্ট্রের কিছু নীতিনির্ধারক মহল বিশ্বাস করত যে, সামরিক হামলার মাধ্যমে ইরানের প্রতিরোধ কাঠামো ভেঙে দেওয়া সম্ভব এবং তেহরান ওয়াশিংটনের দাবি মানতে বাধ্য হবে। তবে যুদ্ধের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে, প্রতিরোধ সক্ষমতা কেবল ক্ষেপণাস্ত্র বা যুদ্ধবিমানের সংখ্যার ওপর নির্ভর করে না; বরং এটি সামরিক সক্ষমতা, ঘুরে দাঁড়ানোর ক্ষমতা, অভ্যন্তরীণ ঐক্য, রাজনৈতিক সদিচ্ছা এবং মূল্য চোকাতে প্রস্তুত থাকার এক সম্মিলিত রূপ। এই উপাদানগুলোকে উপেক্ষা করার কারণেই যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক হিসাব-নিকাশ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে।
ভবিষ্যতের পথ: শিক্ষা নাকি সংঘাত?
বর্তমানে পরিস্থিতি এক নতুন মোড় নিয়েছে। ইরানের ওপর রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক চাপ অব্যাহত থাকার পাশাপাশি ডোনাল্ড ট্রাম্প আবারও সামরিক পদক্ষেপ নেওয়ার মতো ভীতি প্রদর্শনের ভাষা ব্যবহার করছেন। এই পরিস্থিতি প্রমাণ করে, ওয়াশিংটন আবারও এমন এক চৌরাস্তায় এসে দাঁড়িয়েছে, যেখানে তাদের দুটি ভিন্ন পথের যেকোনো একটি বেছে নিতে হবে। হয় তাদের অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে মেনে নিতে হবে যে, কেবল সামরিক শক্তি দিয়ে এই সংকটের সমাধান সম্ভব নয়; নতুবা আবারও সেই একই পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও ভুলের পথে হাঁটতে হবে। যেই পথ অতীতে যুক্তরাষ্ট্রের ঘোষিত লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থই হয়নি, বরং দেশটির ওপর বিপুল ব্যয়ের বোঝাও চাপিয়েছে।
একই ব্যর্থ অনুমানের পুনরাবৃত্তি সীমিত সামরিক সংঘাতের চেয়েও ভয়াবহ পরিস্থিতি ডেকে আনতে পারে। পশ্চিম এশিয়া (মধ্যপ্রাচ্য) অঞ্চল আজ অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি জটিল। একই সঙ্গে একাধিক ফ্রন্টে সংঘাত, বৃহৎ পরাশক্তিগুলোর প্রতিযোগিতা, জ্বালানি সংকট এবং বিশ্ব অর্থনীতির ভঙ্গুর দশা যেকোনো উত্তেজনা বৃদ্ধিকেই আন্তর্জাতিক সংকটে রূপ দিতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো নতুন সামরিক সিদ্ধান্ত এমন এক ধারাবাহিক প্রতিক্রিয়ার (চেইন রিঅ্যাকশন) জন্ম দিতে পারে, যা নিয়ন্ত্রণ করা খোদ যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষেও সহজ হবে না।প্রতিরোধের নতুন সমীকরণ ও বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা
সাম্প্রতিক বছরগুলোর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, এই অঞ্চলে প্রতিরোধের ধারণায় ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। কেবল আকাশপথে শ্রেষ্ঠত্ব বা নিখুঁত হামলার ওপর নির্ভর করে এখন আর প্রতিপক্ষের মনোবল ভেঙে দেওয়া সম্ভব নয়। আঞ্চলিক রাষ্ট্রগুলো নিজেদের মতো করে পালটা জবাব দেওয়ার নানা উপায় তৈরি করেছে, যা সামরিক শক্তি ব্যবহারের খরচ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়ে দিয়েছে। এ কারণেই অনেক পশ্চিমা বিশ্লেষক মনে করেন, হুমকি-ভিত্তিক নীতি ইরানের আচরণ পরিবর্তনের পরিবর্তে বরং তাদের প্রতিরোধের যুক্তিকেই আরও শক্তিশালী করবে এবং অবিশ্বাস বাড়িয়ে তুলবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, যুক্তরাষ্ট্রের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার ওপর এই সিদ্ধান্তের প্রভাব। বৃহৎ পরাশক্তিগুলোকে কেবল তাদের সামরিক ক্ষমতা দিয়ে মাপা হয় না; তাদের গ্রহণযোগ্যতা যৌক্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সংকট ব্যবস্থাপনা এবং দীর্ঘমেয়াদি যুদ্ধের ফাঁদ এড়িয়ে চলার সক্ষমতার ওপরও নির্ভর করে। ওয়াশিংটন যদি একই ভুলের পুনরাবৃত্তি করে, তবে তা বিশ্বের কাছে এই বার্তাই দেবে যে, তারা এখনো তাদের সামরিক সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক লক্ষ্যের মধ্যে ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা করতে পারেনি। এমন ধারণা আমেরিকার আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও দুর্বল করতে পারে এবং তাদের প্রতিদ্বন্দ্বীদের আমেরিকার ক্ষমতার সীমা পরীক্ষা করতে উৎসাহিত করতে পারে।
সতর্কঘণ্টা ও চূড়ান্ত পরিণতি
এই দৃষ্টিকোণ থেকে, ফরেন অ্যাফেয়ার্স-এর সতর্কবার্তাকে কেবল একটি গণমাধ্যমীয় সমালোচনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। এই বিশ্লেষণটি মূলত যুক্তরাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণী কাঠামোর জন্য এক সতর্কঘণ্টা; এটি এই বার্তাই দেয় যে, মূল সমস্যা সামরিক শক্তির অভাব নয়, বরং বাস্তবতাকে মূল্যায়ন করতে ভুল করা এবং সামরিক শক্তির ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরশীলতা। ‘চল্লিশ দিনের যুদ্ধ’-এর অভিজ্ঞতা প্রমাণ করেছে যে, বিশ্বের বৃহত্তম সেনাবাহিনীও কেবল শক্তি প্রদর্শন করে কোনো অঞ্চলের জটিল রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা সমীকরণ নিজেদের পক্ষে বদলে দিতে পারে না।
যুক্তরাষ্ট্র এখন আবারও এক ভাগ্য নির্ধারণী পছন্দের মুখোমুখি। তাদের নীতিনির্ধারকেরা কি অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেবেন, নাকি সামরিক বিজয়ের পুরোনো প্রলোভন আবারও তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করবে? এই প্রশ্নের উত্তর কেবল তেহরান ও ওয়াশিংটনের সম্পর্কের ভবিষ্যৎই নির্ধারণ করবে না, বরং আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং এমনকি আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকেও প্রভাবিত করবে। তবে এটি নিশ্চিত যে, একই কৌশলগত ভুলের পুনরাবৃত্তি কখনোই ভিন্ন কোনো ফলাফল বয়ে আনবে না। আমেরিকা যদি এখনো বিশ্বাস করে যে কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতা পরিবর্তন করা সম্ভব, তবে সম্ভবত তারা আবারও সেই কানাগলিতেই প্রবেশ করবে, যাকে ফরেন অ্যাফেয়ার্স ‘নিজেদের তৈরি করা এক ঘৃণ্য পরিস্থিতি’ বলে আখ্যায়িত করেছে। এটি এমন এক ফাঁদ, যেখানে ঢোকার চেয়ে বের হওয়া অনেক বেশি কঠিন।
সূত্র: মেহের নিউজ যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-৩৫ ধ্বংসের দাবি ইরানেরইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, জর্ডানের আল-আজরাক বিমানঘাঁটিতে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের তিনটি এফ-৩৫ লাইটনিং-২ স্টেলথ যুদ্ধবিমান ধ্বংস এবং আরও তিনটি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক বিবৃতিতে আইআরজিসি এ দাবি জানায়।
ইরান ইন্টারন্যাশনালে প্রকাশিত আইআরজিসির বিবৃতিতে বলা হয়, কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার জবাবে আল-আজরাক বিমানঘাঁটির বিমান পার্কিং এলাকা এবং একটি রক্ষণাবেক্ষণ হ্যাঙ্গার লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়। আইআরজিসির দাবি, হামলায় কয়েকজন মার্কিন সামরিক কর্মকর্তা ও যুদ্ধবিমানের রক্ষণাবেক্ষণ কর্মীও নিহত হয়েছেন।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা ফারস নিউজও আইআরজিসির বরাতে একই দাবি প্রকাশ করেছে। তবে যুক্তরাষ্ট্র এখন পর্যন্ত এ ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির তথ্য নিশ্চিত করেনি। স্বাধীন কোনো আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমও এখনো এই দাবির সত্যতা যাচাই করতে পারেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, একটি এফ-৩৫এ লাইটনিং-২ যুদ্ধবিমানের মূল্য কনফিগারেশন ও ক্রয়চুক্তির ধরন অনুযায়ী ১০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। সে হিসাবে তিনটি যুদ্ধবিমান সত্যিই ধ্বংস হয়ে থাকলে কেবল বিমানগুলোর আর্থিক মূল্যই ৩০০ মিলিয়ন ডলারের বেশি হবে।
এর কয়েক ঘণ্টা আগে মার্কিন সামরিক বাহিনী জানায়, জর্ডানে একটি মার্কিন ঘাঁটিতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র হামলার জবাবে তারা ব্যাপক বিমান অভিযান পরিচালনা করেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, অভিযানে আইআরজিসি-সংশ্লিষ্ট কয়েক ডজন স্থাপনায় হামলা চালানো হয়েছে। লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে ছিল সামরিক কমান্ড সেন্টার, ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন স্থাপনা, উপকূলীয় নজরদারি কেন্দ্র এবং বিভিন্ন প্রতিরক্ষা অবস্থান।
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের খবরে বলা হয়েছে, কেশম দ্বীপে যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় তিনজন নিহত এবং দুজন আহত হয়েছেন।
চলমান সংঘাতের প্রভাব ইরান ও জর্ডানের সীমানা ছাড়িয়ে অন্যান্য দেশেও পড়তে শুরু করেছে। জর্ডানের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা ইরানের নিক্ষেপ করা পাঁচটি ক্ষেপণাস্ত্র ভূপাতিত করেছে বলে জানানো হয়েছে। এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে কুয়েত জানিয়েছে, ইরানের হামলায় একটি চীনা প্রতিষ্ঠানের একটি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে ওই প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মী নিহত হয়েছেন।
কেন গুরুত্বপূর্ণ এফ-৩৫ লাইটনিং-২?
এফ-৩৫ লাইটনিং-২ বিশ্বের সবচেয়ে আধুনিক বহুমুখী স্টেলথ যুদ্ধবিমানগুলোর অন্যতম। শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এড়িয়ে গভীর এলাকায় অভিযান পরিচালনার সক্ষমতার জন্য এটি বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছে।
স্টেলথ প্রযুক্তি, উন্নত সেন্সর ফিউশন এবং অত্যন্ত নির্ভুল লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার সক্ষমতার কারণে এফ-৩৫ একই সঙ্গে লক্ষ্য শনাক্ত, অনুসরণ এবং হামলা চালাতে পারে। পাশাপাশি এটি মিত্র বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রের তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে আদান-প্রদানের সুবিধাও দেয়।
প্র্যাট অ্যান্ড হুইটনির এফ-১৩৫ ইঞ্জিনচালিত এই যুদ্ধবিমান ঘণ্টায় সর্বোচ্চ মাক ১.৬ গতিতে উড়তে সক্ষম। এতে আকাশ থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র এবং নির্ভুলভাবে লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে সক্ষম বিভিন্ন ধরনের বোমা বহনের ব্যবস্থা রয়েছে।
ইরানের সঙ্গে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানে এফ-৩৫ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। বিশেষ করে ক্ষেপণাস্ত্র অবকাঠামোতে হামলা, শত্রুপক্ষের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করা এবং পরবর্তী বিমান অভিযানের পথ সুগম করতে এই যুদ্ধবিমান ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইউত্থান-পতনে ভরা তেহরান-ওয়াশিংটন সম্পর্ক এখন এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে, যেখানে সংঘাত, গভীর অবিশ্বাস এবং সংলাপের কোনো সুস্পষ্ট সম্ভাবনার অভাব চরম আকার ধারণ করেছে। এখন প্রধান প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে—ওয়াশিংটন কি সত্যিই ইরানের সঙ্গে চলমান এই সংকটের ইতি টানতে চাইছে, নাকি তারা আবারও কূটনীতিকে কেবল চাপ প্রয়োগের কৌশলের হাতিয়ার হিসেবেই ব্যবহার করছে?
ইসলামি বিপ্লবের বিজয়ের শুরুতে ‘গুপ্তচরদের আস্তানা’ (তেহরানের মার্কিন দূতাবাস) দখলের পর থেকে দুই দেশের মধ্যে ধারাবাহিক সংকট, অসমাপ্ত আলোচনা, নিষেধাজ্ঞা, পালটাপালটি হুমকি এবং পরোক্ষ সংঘাতের দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। ২০১৫ সালের পরমাণু চুক্তির কারণে এই বৈরী সম্পর্ক সাময়িকভাবে সংলাপের পথে এগোলেও, ২০১৮ সালে চুক্তি (জেসিপিওএ) থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বেরিয়ে যাওয়া এবং ‘সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ’ নীতিতে ফিরে আসার কারণে উভয় পক্ষের আস্থার ভঙ্গুর ভিত্তিটিও ধ্বংস হয়ে যায়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে, ট্রাম্প প্রশাসনের অবস্থান চুক্তির সম্ভাবনা এবং কঠোর সামরিক হামলার হুমকির মধ্যে দুলছে। কারণ, তারা কূটনীতিকে চাপ প্রয়োগ এবং মাঠপর্যায়ের হিসাব-নিকাশের ওপর নির্ভরশীল একটি হাতিয়ারে পরিণত করেছে। অন্যদিকে ইরান জোর দিয়ে বলছে যে, তারা সরাসরি আলোচনার টেবিলে ফেরার কোনো অনুরোধ করেনি। পাশাপাশি ওয়াশিংটনের প্রতিশ্রুতির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও তেহরান সন্দিহান।
মার্কিন ঘাঁটিতে হামলার বিস্তৃতি, ইরাকে প্রতিরোধ বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযানে সৌদি আরবের আরও প্রকাশ্য উপস্থিতি, লোহিত সাগরে উত্তেজনা এবং এই সংকটে মিসরের জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা ইঙ্গিত দেয় যে—তেহরান ও ওয়াশিংটনের মধ্যকার বিরোধ এখন আর নিছক দ্বিপক্ষীয় সংঘাত নয়, এর প্রভাব পুরো অঞ্চলজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সামরিক ব্যয়, বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ, জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং যুক্তরাষ্ট্রের অস্ত্রের মজুত কমে যাওয়ার পাশাপাশি মার্কিন অভ্যন্তরীণ নির্বাচনি হিসাব-নিকাশ—সব মিলিয়ে রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণকে আরও জটিল করে তুলেছে এবং একটি টেকসই চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনাকে দূরে ঠেলে দিয়েছে।
ইরান ইস্যুতে সম্ভাব্য লক্ষ্য অর্জনে হোয়াইট হাউসের হাতে থাকা হাতিয়ারগুলো নিচে তুলে ধরা হলো:
জোরপূর্বক কূটনীতির ধারাবাহিকতা
ইরান নিয়ে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্য ও অবস্থান থেকে বোঝা যায়, তিনি কূটনীতিকে পারস্পরিক আস্থার ভিত্তিতে কোনো স্থিতিশীল ও টেকসই পথ হিসেবে দেখেন না; বরং সামরিক চাপের পাশাপাশি একে একটি সাময়িক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করতে চান। যুক্তরাষ্ট্রের ৪৭তম প্রেসিডেন্ট এখনো তেহরানের সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর সম্ভাবনার কথা বলছেন এবং আলোচনা থেকে ফল আসতে পারে বলে জোর দিচ্ছেন। তবে একই সঙ্গে তিনি ইরানের ওপর ভয়াবহ বোমা হামলার কঠোর হুমকি দিচ্ছেন এবং প্রকাশ্যেই বলছেন যে, ইরানি কর্মকর্তাদের ওপর তিনি আস্থা হারিয়েছেন।
তেহরানের প্রতিনিধিদের আলোচনার ধরন নিয়েও তিনি সমালোচনা করেছেন। তার দাবি, ইরানিরা এমন সব বিষয় নিয়ে দীর্ঘ সময় ব্যয় করেন, যা তার মতে খুব কম সময়েই সমাধান করা সম্ভব। এসব বক্তব্য থেকে এটি স্পষ্ট যে, প্রচলিত অর্থে কূটনীতির প্রতি ট্রাম্পের খুব একটা দায়বদ্ধতা নেই। তিনি কেবল তখনই আলোচনা মেনে নেন, যখন তা যুক্তরাষ্ট্রের দাবি অনুযায়ী দ্রুত ও অনুকূল ফলাফল বয়ে আনে। বস্তুত, এই অবস্থানগুলোর মাধ্যমে এটা বোঝা যায় যে ট্রাম্পের কাছে কূটনীতি ও সামরিক পদক্ষেপ হলো দুটি পরিপূরক হাতিয়ার। পরিস্থিতি অনুযায়ী এই হাতিয়ারগুলো চাপ বাড়াতে, ইরানকে পিছু হটতে বাধ্য করতে এবং ওয়াশিংটনের কাঙ্ক্ষিত রূপরেখা চাপিয়ে দিতে ব্যবহার করা হয়।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন