শত্রুর মুখে সৈন্যদের ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ

কুয়েতে মার্কিন সেনাদলের অপারেশন সেন্টারে একটি ইরানি আত্মঘাতী ড্রোন আঘাত হানার ঠিক কয়েক সেকেন্ড পরের ঘটনা। ভেতরে থাকা সৈন্যদের সুরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত এক মার্কিন আর্মি জেনারেল মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ালেন। নিজের প্রটেক্টিভ ভেস্ট এবং হেলমেটটা টেনে নিয়ে পাশে থাকা এক সৈন্যকে চিৎকার করে আদেশ দিলেন- ‘এখান থেকে পালাও!’ দিনটি ছিল মার্চের ১ তারিখ। ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শুরু হওয়ার মাত্র একদিন পরের ঘটনা।
কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে অবস্থিত ওই ভবনের ঠিক মাঝখানটিতে ড্রোনটি আঘাত হানে। এর প্রচণ্ড বিস্ফোরণে ভেতরে থাকা সৈন্যরা দেয়ালে গিয়ে আছড়ে পড়েন এবং মুহূর্তের মধ্যে ভবনটিতে ভয়াবহ আগুন ধরে যায়—সেদিনের হামলায় বেঁচে ফেরা সৈন্যরা সেই নারকীয় অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়েছেন। ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ক্লিন্ট বার্নস যখন জরুরি বহির্গমন পথ দিয়ে প্রাণভয়ে পাশের একটি সুরক্ষিত বাঙ্কারের দিকে দৌড়াচ্ছিলেন, তখনো তার অধীনস্থ ডজন ডজন নারী ও পুরুষ সেনা জ্বলন্ত ভবনের ভেতরে আটকা পড়ে ছিলেন। জেনারেলের সঙ্গে পালিয়ে যাওয়ার নির্দেশ পাওয়া সেই সৈন্যটি পরবর্তীকালে জানান, ‘আমাদের ওই ভবন ছেড়ে ওভাবে পালিয়ে আসা উচিত হয়নি।’ বাঙ্কারের ইস্পাতের দরজা খোলার পর যখন তিনি পুনরায় ভেতরে আটকে পড়াদের সাহায্য করতে যেতে চেয়েছিলেন, তখন জেনারেল বার্নস তাকে কড়া ভাষায় সেখানে স্থির থাকার নির্দেশ দেন। কাঁপানো গলায় সেই সৈন্যটি বলেন, ‘আমি তো আর চোখের সামনে ওভাবে মানুষ মরতে দেখতে পারি না।’ পরবর্তীতে আগুনের দিকে ছুটে যাওয়া অন্য এক অফিসারের উৎসাহে সেই সৈন্যটি অপারেশন সেন্টারে ফিরে যান এবং ঘন ধোঁয়ার মধ্যে চিৎকার করে বেঁচে থাকা কাউকে খোঁজার চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু সেই জেনারেল আর ফিরে আসেননি। ড্রোন হামলার পর জেনারেল বার্নসের এই পলায়ন এবং সিদ্ধান্তহীনতা শুয়াইবা বন্দরে মোতায়েন করা সৈন্যদের মনে তাদের নেতৃত্বের প্রতি তীব্র ক্ষোভ ও তিক্ততার জন্ম দিয়েছে। মার্কিন সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা যখন এই ঘটনার অভ্যন্তরীণ তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করছেন, ঠিক তখনই ১৭ জন প্রত্যক্ষদর্শী ও সেনাসদস্য এই বিস্ফোরক তথ্য ফাঁস করেন। ইউএস আর্মির ১০৩তম সাসটেইনমেন্ট কমান্ডের ৬ জন সৈন্য এই হামলায় নিহত হন এবং ডজনখানেক সৈন্য গুরুতর আহত হন। ইরানের সঙ্গে চলা এই যুদ্ধে মার্কিন সেনাদের জন্য এটি ছিল অন্যতম বড় ও ব্যয়বহুল ক্ষয়ক্ষতি, যা তৎকালীন ট্রাম্প প্রশাসনের যুদ্ধনীতির বিরুদ্ধে মার্কিন জনগণের ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়। একই সঙ্গে, ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে সৈন্যদের পাঠানোর আগে তাদের সুরক্ষার জন্য পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল কিনা—তা নিয়েও বড় ধরনের প্রশ্ন ওঠে। নিরাপত্তার স্বার্থে এবং সামরিক বাহিনীর তদন্তের গোপনীয়তা রক্ষার্থে নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেছেন বেঁচে যাওয়া সৈন্য এবং তদন্তের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। শত্রুর মুখে সৈন্যদের ঠেলে দেওয়ার অভিযোগ শুয়াইবা বন্দরের এই ঘটনা সৈন্যদের মনে এক গভীর অপরাধবোধ ও বিশ্বাসঘাতকতার জন্ম দিয়েছে। অনেকে ভাবছেন তারা নিহত সহকর্মীদের বাঁচাতে আরও কিছু করতে পারতেন কিনা। আবার আহত সৈন্যরা অভিযোগ করেছেন, মার্কিন সামরিক চিকিৎসা ব্যবস্থা তাদের চরম অবহেলা করেছে। সবচেয়ে বড় ক্ষোভের তীর জেনারেল বার্নস এবং তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জন হিনসনের বিরুদ্ধে। সৈন্যদের অভিযোগ, উভয়েই জানতেন যে শুয়াইবা বন্দরটি ইরানের সম্ভাব্য হামলার তালিকায় রয়েছে। ইন্টেলিজেন্সের এমন স্পষ্ট সতর্কবার্তা এবং ড্রোন প্রতিরক্ষায় ঘাঁটির দুর্বলতার কথা অভ্যন্তরীণ রিপোর্টে উল্লেখ থাকা সত্ত্বেও জেনারেলরা জোর করে সৈন্যদের সেখানে পাঠান। এর আগে ২০২৪ সালে জর্ডানে অপর্যাপ্ত আকাশ প্রতিরক্ষার কারণে ইরানি প্রক্সিদের ড্রোন হামলায় ৩ মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটলেও, শুয়াইবা বন্দরে সেই ভুল থেকে কোনো শিক্ষা নেওয়া হয়নি। সেখানে আকাশ থেকে নজরদারি এড়ানোর বা ড্রোন হামলা ঠেকানোর মতো কোনো উপরিভাগের ছাউনি বা শেড ছিল না। এমনকি ডিসেম্বরে ট্রাম্প প্রশাসন যখন মধ্যপ্রাচ্যে সামরিক শক্তি বাড়াচ্ছিল, তখন এই দুই জেনারেলকে পরিষ্কার জানানো হয়েছিল যে, ইরানের শীর্ষ নেতৃত্বকে খতম করা হলে তারা শুধু মার্কিন সামরিক ঘাঁটি নয়, বরং যেকোনো মার্কিন স্থাপনায় হামলা চালাবে। এক সৈন্য জেনারেল বার্নসকে যুদ্ধের আগেই বলেছিলেন, ‘আমাদের পরিকল্পনা বদলানো দরকার, এটা অত্যন্ত বিপজ্জনক।’ কিন্তু সেই কথায় কান দেওয়া হয়নি। তীব্র যুদ্ধ শুরুর আগের দিনগুলোতে সৈন্যরা নিজেদের উদ্যোগে ঘাঁটির লাউডস্পিকার চালিত সতর্কসংকেত ব্যবস্থা সচল করেন। তবে তারা যখন ট্রাক-মাউন্টেড ড্রোন ডিফেন্স সিস্টেম ‘ঈগলস’ চেয়েছিলেন, তখন সেন্ট্রাল কমান্ড সম্পদের স্বল্পতার অজুহাতে তা প্রত্যাখ্যান করে। এমনকি সৈন্যরা সেখানে অস্ত্র ছাড়াই অবস্থান করছিলেন; তাদের সমস্ত স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র আরিফজান ঘাঁটির আর্মস রুমেই রেখে আসা হয়েছিল। হামলার সেই ভয়াবহ মুহূর্ত ২৮ ফেব্রুয়ারি রাত ১টা ১৫ মিনিটে মার্কিন ও ইসরাইলি বাহিনী যৌথভাবে ইরানের ওপর ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ শুরু করে। প্রথম ২৪ ঘণ্টাতেই ইরানের ১,০০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়। জবাবে ইরানও ঝাঁকে ঝাঁকে ড্রোন ও মিসাইল ছোড়ে। ১ মার্চ ভোর সাড়ে ৪টায় শুয়াইবা বন্দরে শেষবারের মতো সতর্কসংকেত বাজানো হয়। সৈন্যরা দীর্ঘ চার ঘণ্টা বাঙ্কারে কাটানোর পর ক্লান্ত হয়ে পড়েন এবং কাজের তাগিদে অনেকেই ‘অল ক্লিয়ার’ বা বিপদমুক্ত ঘোষণার আগেই মূল ভবনে ফিরে আসেন। সকাল ৯টার দিকে আনুষ্ঠানিকভাবে ‘অল ক্লিয়ার’ ঘোষণা দেওয়া হয় (যদিও পরবর্তীতে আর্মি তদন্তে এই ঘোষণার কোনো লিখিত লগ পাওয়া যায়নি)। এর ঠিক ৩০ মিনিট পর, সকাল সাড়ে ৯টায় একটি একক ইরানি ‘শাহেদ’ আত্মঘাতী ড্রোন সোজা এসে ভবনের কেন্দ্রবিন্দুতে আঘাত হানে। বাইরে থাকা দুই সৈন্য জানান, তারা ঘাস কাটার মেশিনের মতো এক ধরনের শোঁ শোঁ শব্দ শুনতে পান এবং তাকিয়ে দেখেন ড্রোনটি প্রায় খাড়াভাবে ভবনের ওপর আছড়ে পড়ছে। চোখের পলকে পুরো ভবনের বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং লোহা, কাচ ও প্লাস্টিকের টুকরো ছিটকে এসে ঘরের ভেতরে থাকা সৈন্যদের শরীর ঝাঁঝরা করে দেয়। বিস্ফোরণের ধাক্কায় হুলুস্থুল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। মাথায় স্প্লিন্টার বিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও মেজর স্টিফেন রামসবটম ধোঁয়ার মধ্য থেকে একে একে নিহত ও আহত সৈন্যদের টেনে বের করতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘আমি সেখানে কোনো জেনারেলকে দেখিনি। পরে শুনলাম জেনারেল হিনসনের মুখ দিয়ে প্রচুর রক্ত পড়ছিল এবং তারা বাঙ্কারের পাশে বসে ছিলেন।’ ইউএস আর্মি সেন্ট্রাল কমান্ড অবশ্য দাবি করেছে যে, জেনারেলরা আহত হওয়া সত্ত্বেও মাঠপর্যায়ে সৈন্যদের সরিয়ে নেওয়ার কাজে সরাসরি সহায়তা করেছিলেন। এই হামলায় মেজর কোডি এ. খোর্ক (৩৫), চিফ ওয়ারেন্ট অফিসার রবার্ট এম. মারজান (৫৪), মাস্টার সার্জেন্ট নোয়া এল. টিটজেন্স (৪২), মাস্টার সার্জেন্ট নিকোল এম. আমোর (৩৯), সার্জেন্ট ডিক্লান জে. কোডি (২০) এবং মেজর জেফরি আর. ওব্রায়েন (৪৫) নিহত হন। চিকিৎসার নামে চরম অবহেলা ও ‘নিজেদের তদন্ত নিজেরা’ করার চেষ্টা আহত সৈন্যরা কুয়েতের স্থানীয় হাসপাতালে প্রাথমিক চিকিৎসা পাওয়ার পর জার্মানিতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক বাহিনীর বিখ্যাত ‘ল্যান্ডস্টুল রিজিওনাল মেডিকেল সেন্টার’-এ পৌঁছান। তারা ভেবেছিলেন সেখানে উন্নত চিকিৎসা পাবেন। কিন্তু জার্মানিতে পৌঁছানোর পর চিকিৎসকরা তাদের জানান, ফ্লাইটের মেনিফেস্টে বা ক্যাজুয়ালটি ডেটাবেজে তাদের নাম ‘গুরুতর আহত’ বা ‘মেডিকেল ইভাকুই’ হিসেবে নথিভুক্তই করা হয়নি! ফলে হাসপাতালটি তাদের ভর্তি করতে অস্বীকৃতি জানায় এবং কেবল বহির্বিভাগের রোগী হিসেবে ব্যান্ডেজ বেঁধে ব্যারাকে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেন্ট্রাল কমান্ড অবশ্য এই দাবি অস্বীকার করে বলেছে, থিয়েটারেই তাদের ক্ষতের শ্রেণিবিন্যাস করা হয়েছিল এবং তারা নিয়মিত চিকিৎসা পেয়েছেন। এদিকে, এই ট্র্যাজেডির তদন্তের জন্য জেনারেল হিনসন প্রথমে তারই অধীনস্থ এক মাঝারি পদের কর্মকর্তাকে দায়িত্ব দেন, যা সৈন্যদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের সৃষ্টি করে। সৈন্যরা মনে করেছিলেন, নেতৃত্ব নিজেদের দোষ ঢাকতেই এই ‘নিজেদের লোক দিয়ে তদন্ত’ করাচ্ছেন। পরবর্তীতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে এই তদন্তভার আর্মি সেন্ট্রাল কমান্ডের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হাতে ন্যস্ত করা হয়। তদন্তের চূড়ান্ত প্রতিবেদন অনুমোদন করেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল প্যাট্রিক ফ্রাঙ্ক (যিনি বর্তমানে ইউএস সেন্ট্রাল কমান্ডের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ জেনারেল)। তবে মার্কিন কর্মকর্তারা নিশ্চিত করেছেন যে, এই তদন্ত প্রতিবেদনে হামলার জন্য কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা বা কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থার সুপারিশ করা হয়নি। এটি কবে নাগাদ জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে, তাও স্পষ্ট নয়। জার্মানিতে এক সপ্তাহ কাটানোর পর আহত ও বেঁচে যাওয়া সৈন্যরা যখন আমেরিকার উদ্দেশ্যে বিমানে উঠছিলেন, তখন তাদের ব্যাগেজ ওজন করার সময় দেখা যায় ব্যাগের সংখ্যা অনেক বেশি। এক সৈন্য অশ্রুভেজা চোখে বলেন, ‘আমরা আমাদের সেইসব ভাইদের জিনিসপত্রও বয়ে নিয়ে যাচ্ছিলাম, যারা আর কোনোদিন আমাদের সঙ্গে ফিরে যাবে না।’

মন্তব্যসমূহ

এই ব্লগটি থেকে জনপ্রিয় পোস্টগুলি

The science-policy imperative in the final stretch to 2030 and beyond

Any support whether through donating, sharing our campaign, or keeping us in your prayers can make a real difference for us during this difficult time. If you are able to help or share, here is our campaign link: https://gogetfunding.com/from-death-to-life-evacuate-my-family-from-gaza/

Israeli Airstrike Destroys Al-Muttaqin Mosque Near Gaza Displacement Camp